স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী
Swami Vivekananda Biography in Bengali
ভূমিকা
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় মহাপুরুষ। তাঁর ছোট জীবনের মধ্যেই তিনি আধ্যাত্মিকতা, মানবসেবা, শিক্ষা, ভারতীয় সংস্কৃতি এবং বেদান্তের আদর্শকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেন।
তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য ছিলেন এবং ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভাবধারাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। দরিদ্র ও দুঃখী মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
স্বামী বিবেকানন্দের জীবন থেকে জ্ঞান, শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস, ত্যাগ, মানবসেবা এবং আধ্যাত্মিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
এক নজরে স্বামী বিবেকানন্দ
সূচিপত্র
জন্ম
১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি, ২৯শে পৌষ ১২৬৯ বঙ্গাব্দে পৌষ সংক্রান্তির দিনে স্বামী বিবেকানন্দ জন্মগ্রহণ করেন।
জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সকাল ৬টা ৩৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে তাঁর জন্ম হয়।
তাঁর মায়ের বিশ্বাস ছিল কাশীর বীরেশ্বর শিবের অনুগ্রহে এই পুত্রের জন্ম। তাই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘বীরেশ্বর’। পরবর্তীতে বীরেশ্বর থেকে ডাকনাম হয় ‘বিলে’।
পরিবার পরিচয়
স্বামী বিবেকানন্দের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার ডেরেটোনা গ্রামে।
ব্রিটিশ আমলের শুরুতে তাঁদের পরিবার কলকাতায় চলে আসে। প্রথমে গড় গোবিন্দপুর এবং পরে উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে বসবাস করেন।
যে বাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দ জন্মগ্রহণ করেন সেটি তাঁর প্রপিতামহ রামমোহন দত্ত তৈরি করেছিলেন।
রামমোহনের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্গাচরণ দত্ত অল্প বয়সেই সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন। তাঁর পুত্র বিশ্বনাথ দত্ত নিজের চেষ্টায় বড় হয়ে অ্যাটর্নির পেশা গ্রহণ করেন।
বিশ্বনাথ দত্তের সঙ্গে সিমলার নন্দলাল বসুর একমাত্র কন্যা ভুবনেশ্বরী দেবীর বিবাহ হয়। তাঁদের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন।
স্বামী বিবেকানন্দের বাবার নাম — বিশ্বনাথ দত্ত
স্বামী বিবেকানন্দের বাবার নাম ছিল বিশ্বনাথ দত্ত।
বিশ্বনাথ দত্ত অত্যন্ত উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। খাদ্য, পোশাক ও আদব-কায়দায় তিনি হিন্দু-মুসলিম মিশ্র সংস্কৃতির অনুরাগী ছিলেন এবং কর্মক্ষেত্রে ইংরেজদের অনুসরণ করতেন।
তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন, কিন্তু অর্থ সঞ্চয়ের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না। বহু আত্মীয় ও দরিদ্র মানুষকে তিনি সাহায্য ও প্রতিপালন করতেন।
বিশ্বনাথ দত্ত সাতটি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। ইতিহাস ও সংগীত ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়।
স্বামী বিবেকানন্দের মায়ের নাম — ভুবনেশ্বরী দেবী
স্বামী বিবেকানন্দের মায়ের নাম ভুবনেশ্বরী দেবী।
তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও অভিজাত প্রকৃতির নারী। দরিদ্র ও দুঃখী মানুষ তাঁর কাছ থেকে কখনো খালি হাতে ফিরে যেত না।
সংসারের সমস্ত কাজ তিনি নিজে দেখাশোনা করতেন। নিয়মিত পূজা-পাঠ, শাস্ত্রপাঠ এবং সেলাইয়ের কাজও করতেন।
নরেন্দ্রনাথ তাঁর মায়ের কাছেই প্রথম ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন।
স্বামী বিবেকানন্দের ছোটবেলা
ছোটবেলা থেকেই নরেন্দ্রনাথের মধ্যে অসাধারণ মেধা, তেজস্বিতা, সাহস, স্বাধীন মনোভাব, হৃদয়বত্তা, বন্ধুপ্রীতি এবং খেলাধুলার প্রতি আকর্ষণ দেখা যেত।
একই সঙ্গে তাঁর মধ্যে প্রবল আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা ছিল। ‘ধ্যান ধ্যান’ খেলতে খেলতে তিনি সত্যিই গভীর ধ্যানে ডুবে যেতেন।
তিনি রাম-সীতা ও শিবের পূজা করতেন। সাধু-সন্ন্যাসী দেখলেই তাঁদের প্রতি অজানা আকর্ষণে ছুটে যেতেন।
ঘুমানোর আগে জ্যোতিঃদর্শন তাঁর প্রতিদিনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা ছিল বলে জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরেন্দ্রনাথ স্কুলের বিতর্ক ও আলোচনা সভার মধ্যমণি হয়ে ওঠেন। খেলাধুলায় নেতৃত্ব, উচ্চাঙ্গ সংগীত ও ভজনে গান, নাটকে অভিনয় এবং বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই গভীর চিন্তাশীল হয়ে ওঠেন।
সন্ন্যাস জীবনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বাড়লেও তিনি জগতের প্রতি নিষ্ঠুর ছিলেন না। বরং মানুষের বিপদে সর্বদা সাহায্যের জন্য এগিয়ে যেতেন।
শিক্ষাজীবন
১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে মেট্রোপলিটন স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে নরেন্দ্রনাথ প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।
পরে ম্যালেরিয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি কলেজটি ছেড়ে জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশনে ভর্তি হন, যা বর্তমানে স্কটিশ চার্চ কলেজ নামে পরিচিত।
সেখান থেকে ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে F.A. এবং ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে B.A. পাশ করেন।
পরীক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব না দিলেও তাঁর বিদ্যানুরাগ প্রবল ছিল এবং পড়াশোনার পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত।
ছাত্রাবস্থায় তিনি দার্শনিক হার্বার্ট স্পেন্সারের একটি মতবাদের সমালোচনা করে তাঁকে চিঠি লিখেছিলেন। স্পেন্সার তাঁর সমালোচনার প্রশংসা করেছিলেন বলে জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের পরিচয়
১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে কলকাতায় সুরেন মিত্রের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে নরেন্দ্রনাথের প্রথম দেখা হয়।
পরে দক্ষিণেশ্বরে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়। সেখানে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে সরাসরি প্রশ্ন করেন:
রামকৃষ্ণ : হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি তাঁকে দেখতে পাই, তোমায় যেমন দেখি, তার চেয়েও স্পষ্টভাবে তাঁকে দেখি।
নরেন্দ্রনাথ সহজে শ্রীরামকৃষ্ণকে গ্রহণ করেননি। তিনি বারবার পরীক্ষা করে তাঁর ত্যাগ, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেন।
প্রায় চার বছর তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ছিলেন। এই সময়ে তাঁর মধ্যে নানা আধ্যাত্মিক অনুভূতির বিকাশ ঘটে।
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর বাবা বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যু হয়। এরপর তিনি প্রচণ্ড আর্থিক সংকটে পড়েন।
শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগ
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামকৃষ্ণ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাঁকে শ্যামপুকুরে এবং পরে কাশীপুরের একটি ভাড়া বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
নরেন্দ্রনাথ গুরুভাইদের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সেবা এবং গভীর আধ্যাত্মিক সাধনায় যুক্ত হন।
নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধিতে দিনরাত ডুবে থাকতে চাইলেও শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে শুধু নিজের মুক্তির জন্য নয়, মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে বলেন।
মানুষের সেবার মধ্য দিয়ে ভগবানের উপাসনার যে আদর্শ স্বামী বিবেকানন্দ পরবর্তীকালে প্রচার করেন, তার উৎস হিসেবে এই ঘটনাকে জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট শ্রীরামকৃষ্ণ দেহত্যাগ করেন।
রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা
শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর নরেন্দ্রনাথ কয়েকজন গুরুভাইকে নিয়ে বরানগরের একটি পুরনো ভাঙা বাড়িতে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন।
চরম দারিদ্র্য, অনশন ও অর্ধাশন তাঁদের নিত্যসঙ্গী ছিল। তার মধ্যেও তীব্র তপস্যা, ভজন-কীর্তন ও শাস্ত্র আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের দিন কাটত।
সন্ন্যাস গ্রহণ
১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর দশজন গুরুভাই সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।
সন্ন্যাস গ্রহণের পর নরেন্দ্রনাথের নাম হয় স্বামী বিবিদিষানন্দ।
স্বামী বিবেকানন্দের বিভিন্ন নাম
- বিবিদিষানন্দ
- সচ্চিদানন্দ
- বিবেকানন্দ
শিকাগোর বিশ্বধর্ম মহাসভায় তিনি ‘বিবেকানন্দ’ নামে পরিচিত হন। এরপর বিশ্ববাসী তাঁকে মূলত এই নামেই চিনতে শুরু করে।
পরিব্রাজক বিবেকানন্দ
সন্ন্যাস গ্রহণের পর স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর সন্ন্যাসী গুরুভাইরা পরিব্রাজক হিসেবে বিভিন্ন স্থানে বেরিয়ে পড়তেন।
কখনো একা এবং কখনো কয়েকজন মিলে তাঁরা ভ্রমণ করতেন।
ভারত ভ্রমণ
স্বামী বিবেকানন্দ পায়ে হেঁটে প্রায় সমগ্র ভারত পরিক্রমা করেন।
শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-নির্ধন, রাজা-মহারাজা, ব্রাহ্মণ, চণ্ডালসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।
এই ভ্রমণের সময় তিনি প্রকৃত ভারতবর্ষের রূপকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
বিদেশ যাত্রা
১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট তিনি যে ভ্রমণে বের হন, সেটি ছিল তাঁর দীর্ঘতম ভ্রমণগুলির অন্যতম।
তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে অনেকে তাঁকে আমেরিকার বিশ্বধর্ম মহাসভায় যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
পরে মাদ্রাজের মানুষের প্রবল ইচ্ছা এবং আধ্যাত্মিক নির্দেশের পর তিনি আমেরিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আমেরিকা যাত্রা
স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আমেরিকায় গিয়েছিলেন বলে জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে তিনি বোম্বাই থেকে জাহাজে আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
২৫ জুলাই ভ্যাঙ্কুভারে পৌঁছান এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে ৩০ জুলাই সন্ধ্যায় শিকাগো পৌঁছান।
ধর্মমহাসভার সময় বাকি থাকায় কম খরচে থাকার জন্য তিনি বস্টনে যান।
সেখানে বিভিন্ন পণ্ডিত ও অধ্যাপকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁদের মধ্যে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাইট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শিকাগো বক্তৃতা
১১ সেপ্টেম্বর বিশ্বধর্ম মহাসভা শুরু হয়। স্বামী বিবেকানন্দ বিকেলে বক্তৃতা দেন।
এই সম্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সাত হাজার শ্রোতা তাঁকে বিপুল অভিনন্দন জানায়।
তাঁর বক্তৃতায় সব ধর্মের প্রতি উদার ও প্রীতিপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ পায়। শ্রোতারা তাঁর বক্তব্যে মুগ্ধ হন।
২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্মমহাসভা চলে। স্বামীজিকে প্রায় প্রতিদিন বক্তৃতা দিতে হতো।
তাঁর উদার ও যুক্তিমূলক চিন্তার জন্য তাঁকে ধর্মমহাসভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ধর্ম প্রচার
আমেরিকায় ধর্ম প্রচার
শিকাগোর পর স্বামীজি আমেরিকার বিভিন্ন বড় শহরে ধর্ম ও বেদান্তের ভাবধারা প্রচার করতে থাকেন।
বিশেষ করে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
ইংল্যান্ডে ধর্ম প্রচার
১৮৯৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি ইউরোপে যান। প্যারিস ও লন্ডনে প্রচার করে ডিসেম্বর মাসে আবার আমেরিকায় ফিরে আসেন।
১৮৯৬ সালের ১৫ এপ্রিল আমেরিকা থেকে বিদায় নিয়ে তিনি আবার লন্ডনে আসেন।
কলকাতায় ফিরে আসা
পাশ্চাত্যে তাঁর সাফল্য ভারতবাসীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তোলে।
ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল্য সম্পর্কে দেশবাসীর মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।
কলম্বো থেকে শুরু করে রামনাদ, মাদ্রাজ এবং কলকাতার পথে সর্বত্র তাঁকে বিপুল অভিনন্দন জানানো হয়।
১৯ ফেব্রুয়ারি স্বামীজি কলকাতায় পৌঁছালে তাঁকে অভূতপূর্বভাবে স্বাগত জানানো হয়।
দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘ প্রতিষ্ঠা
- স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে মাদ্রাজে পাঠিয়ে শাখা কেন্দ্র গড়ে তুলতে বলেন।
- স্বামী অখণ্ডানন্দ মুর্শিদাবাদের সারগাছিতে স্থায়ী সেবাশ্রম গড়ে তোলেন।
- স্বামী সারদানন্দকে আমেরিকার কার্যভার দেওয়া হয়।
- স্বামী অভেদানন্দকে ইংল্যান্ডের কার্যভার দেওয়া হয়।
রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপন
১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মে স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশন-এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা করেন।
বিদেশে থাকাকালীন তাঁর চিন্তা ছিল গঙ্গাতীরে সংঘের জন্য একটি স্থায়ী জমি কেনা।
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। ৯ ডিসেম্বর ১৮৯৮ বেলুড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়।
আবার বিদেশ যাত্রা
১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন স্বামী বিবেকানন্দ তৃতীয়বারের জন্য পাশ্চাত্যে যাত্রা করেন।
প্রায় দুই সপ্তাহ ইংল্যান্ডে থেকে আগস্ট মাসে আমেরিকায় পৌঁছান।
আমেরিকায় তিনি প্রায় এক বছর ছিলেন এবং ৯০টিরও বেশি বক্তৃতা দেন।
এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাজকর্মের অগ্রগতি দেখা এবং সেগুলির ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করা।
প্যারিস, ভিয়েনা, কনস্টান্টিনোপল, এথেন্স ও মিশর হয়ে তিনি ৯ ডিসেম্বর ১৯০০ বেলুড় মঠে ফিরে আসেন।
মহাসমাধির পথে স্বামী বিবেকানন্দ
দেশে ফিরে ২৭ ডিসেম্বর তিনি মায়াবতীর উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং ১৯০১ সালের ২৪ জানুয়ারি ফিরে আসেন।
৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাস্ট ডিড রেজিস্ট্রি হয়।
১০ ফেব্রুয়ারি মঠের ট্রাস্টিদের অনুমোদনক্রমে স্বামী ব্রহ্মানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ এবং স্বামী সারদানন্দ সম্পাদক হন।
এরপর স্বামীজি সংঘের দৈনন্দিন কার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে জীবনের শেষ দুই বছর মহাসমাধির জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন।
স্বামী বিবেকানন্দের দেহত্যাগ
স্বামী বিবেকানন্দ ৪ জুলাই ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে বেলুড় মঠে দেহত্যাগ করেন।
সন্ধ্যাবেলা নিজের ঘরে তিনি ধ্যান করেন। রাত ৯টা ১০ মিনিটে সেই ধ্যান মহাসমাধিতে পরিণত হয়।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন।
জাতীয় যুব দিবস
দেশের প্রগতি ও অগ্রগতির জন্য স্বামী বিবেকানন্দ যুব সমাজের মধ্যে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস সঞ্চারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তাঁর জন্মদিন ১২ জানুয়ারি উপলক্ষে প্রতি বছর ভারতে জাতীয় যুব দিবস বা National Youth Day পালিত হয়।
স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা চিন্তা
বিবেকানন্দের মতে, শিক্ষা হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্তা বা পূর্ণতার বিকাশ।
তাঁর মতে মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডার তার নিজের অন্তরের মধ্যেই নিহিত থাকে। বাইরে থেকে শিশুর মধ্যে জ্ঞান সঞ্চালন করা যায় না।
শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে থাকা জ্ঞানভাণ্ডারকে প্রকাশ করতে সাহায্য করবেন।
স্ত্রী শিক্ষা
স্বামী বিবেকানন্দ নারীশিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তিনি মেয়েদের জন্য গ্রামে গ্রামে পাঠশালা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন।
তিনি একদল ব্রহ্মচারিণী গঠনের কথা বলেন, যারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মেয়েদের শিক্ষা দেবেন।
আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও জাপানের মতো প্রগতিশীল দেশের উন্নতিতে তিনি নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ্য করেছিলেন।
ভারতীয় নারীদের দুর্দশা দেখে তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন। নারীর সামাজিক অবমূল্যায়নের জন্য তিনি অশিক্ষাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছিলেন।
জনশিক্ষা
স্বামী বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে ভারতের মানুষের যথার্থ শিক্ষাব্যবস্থা হলো গণশিক্ষা।
তিনি মনে করতেন জনগণের প্রতি অবহেলা ভারতের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ।
তিনি শিক্ষাকে মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আপামর জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেন।
শিক্ষিত যুবকদের গ্রামে গিয়ে দেশের মানুষকে আধুনিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য ও ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান।
স্বামী বিবেকানন্দের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম
- রাজযোগ
- কর্মযোগ
- ভক্তিযোগ
- জ্ঞানযোগ
- মদীয় আচার্যদেব
- ভারতে বিবেকানন্দ
স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য
- অশোকানন্দ
- বিরজানন্দ
- পরমানন্দ
- আলাসিঙ্গা
- পেরুমল
- অভয়ানন্দ
- ভগিনী নিবেদিতা
- সদানন্দ
স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তিত্ব
- সুভাষচন্দ্র বসু
- অরবিন্দ ঘোষ
- মহাত্মা গান্ধী
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- জওহরলাল নেহরু
- নিকোলা টেসলা
- আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু
- অ্যানি বেসান্ত
- নরেন্দ্র মোদি
স্বামী বিবেকানন্দের জীবনপঞ্জি
উপসংহার
ভারতবর্ষের নবজাগরণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দের গভীর প্রভাব ছিল।
তিনি ভারতীয়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, আধ্যাত্মিক চেতনা এবং মানবসেবার আদর্শ জাগিয়ে তুলেছিলেন।
তাঁর জীবন ও চিন্তা ভারতীয় সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং মানবকল্যাণের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।
